‘হোস্টেজ নেগোসিয়েশন’ পদ্ধতিতে উদ্ধার পরা গকে

রাপিড একশান ব্যাটালিয়ন (রাব) ও গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)-র টানা ৪৮ ঘণ্টা লোমহর্ষক অভিযানের মাধ্যমে কেরানীগঞ্জ থেকে অপহৃত শিশু পরাগ মন্ডলকে অবশেষে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। গত মঙ্গলবার গভীররাতে কেরানীগঞ্জের আঁটিবাজার মিল এলাকা থেকে পরাগকে উদ্ধার করা হয়। তবে, কিভাবে এ শিশুকে উদ্ধার করা হলো তা নিয়ে র‌্যাব,

পুলিশ ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পরস্পর বিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। টানা আড়াইদিন অপহরণকারীদের জিম্মায় বন্দি থেকে পরাগ কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়লেও আশার খবর হচ্ছে- চিকিৎসকরা জানিয়েছেন- পরাগ এখন অনেকটাই সুস্থ। পুলিশ ও র‌্যাব জানিয়েছে, অভিনব পদ্ধতির জাল পেতে উদ্ধার করা হয়েছে পরাগকে। এ পদ্ধতিকে পুলিশের ভাষায় বলা হয় ‘হোস্টেজ নেগোশিয়েশন’ পদ্ধতি। অর্থাৎ এক ঢিলে দুই পাখি শিকার। র‌্যাবের মতে, অপহৃতকে জীবিত উদ্ধার করাই ছিল আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর প্রথম উদ্দেশ্য এবং তাতে তারা সফলও হয়েছে। একইভাবে অপরাধীদের আটকের দ্বিতীয় লক্ষ্য নিয়ে বর্তমানে তারা মাঠে নেমেছে। পুলিশের অপর এক সুত্র জানিয়েছে, অপরাধীদের বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করার পর, তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। সুত্র মতে, অপহরণকারীদের ২/১ জনকে হয়তো ইতিমধ্যে পুলিশের নিয়ন্ত্রণে আনা হয়েছে। আর সে জন্য র‌্যাব বলছে, আগামী দু’একদিনের মধ্যে এই দুষ্কৃতিদের ধরা যাবে। বিভিন্ন সূত্র বলেছে, ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে পরাগকে ফিরে পেয়েছে তার পরিবার। কিন্তু পরিবারের পক্ষ থেকে এমন তথ্য অস্বীকার করা হলেও র‌্যাব বলেছে, মুক্তিপণ হোক বা অন্য কিছু হোক কিছু একটা দেওয়া হয়েছে। স্বারষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর বলেছেন, পরাগকে উদ্ধারে টাকা লাগেনি। এই তথ্যও ঠিক নয়। র‌্যাব বলেছে, যে কোন কিছুর বিনিময়ে তারা পরাগকে উদ্ধার করার পণ নিয়েছিল। প্রথমে তারা ২ কোটি টাকা চেয়েছে। পরে অনেক দরকষাকষির পর ৫০ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে। ডিবি পুলিশ বলছে, পরাগকে উদ্ধারে অপহরণকারীদের সঙ্গে টাকার লেনদেনের বিষয়ে তারা কিছুই জানেন না। তবে পরাগকে উদ্ধার করতে তারা অনেক কৌশল অবলম্বন করেছেন।
যেভাবে উদ্ধার হয় পরাগ: ঢাকার এক শীর্ষ সন্ত্রাসীর ব্যবসার মূলধন সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যেই অপহরণ করা হয় শিশু পরাগ মন্ডলকে। অপহরণকারীদের কাছ থেকে পরাগকে উদ্ধারে ডিবি পুলিশ টিমের নেতৃত্ব দেন সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) সানোয়ার হোসেন। পরাগের উদ্ধারের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি ঢাকা টাইমসকে জানান, ১১ নভেম্বর শিশু পরাগ অপহরণের একদিন পর আমরা খবর পাই। তারপরই অপারেশনে নামি। প্রথমে আমরা তাদেরকে চিহ্নিত করার চেষ্টা করি। পরে যেনে যাই শিশু পরাগকে নিয়ে অপহরণকারীরা মোহাম্মদপুরে অবস্থান করছে। তখন আমরা পরাগের বাবাকে নিয়ে অপহরণকারীদের সঙ্গে ‘হোস্টেজ নেগোশিয়েশন’ পদ্ধতি অবলম্বন করি। এটি হচ্ছে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি পদ্ধতির নাম ‘হোস্টেজ নেগোশিয়েশন’। এই পদ্ধতি হলো- অপহরণের পর জিম্মিকে যে কোন কিছুর বিনিময় ‘জীবিত’ উদ্ধার করা। এরপর চলল টানা ৪৮ ঘণ্টার বিরামহীন অভিযান। অভিযানের এক পর্যায়ে ১৩ নভেম্বর দুপুরে অপহরণকারীদের মানসিকভাবে ঘায়েল করতে তাদের একজনের পরিবারের সদস্যদের আটক করে গোয়েন্দা পুলিশ। এরপর চলে পরিবারের সদস্যদের ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ। এবার তাদের মাধ্যমেই অপহরণকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। এরপর রাত ১০ টার দিকে বলা হয় মোহাম্মদপুর বসিলা ব্রিজের কাছে শিশু পরাগকে পাওয়া যাবে। সেখানে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। আবার যোগাযোগ করা হয়। ১১ টার দিকে বলা হয় কেরানীগঞ্জের আটি বাজার মোড়ে তাকে পাওয়া যাবে। সেখানে গিয়েই পাওয়া যায় শিশু পরাগকে। গোয়েন্দা পুলিশের সহকারি কমিশনার সানোয়ার জানান, অপহরণকারীরা পেশাদার নয়। তবে তারা সন্ত্রাসী। মূলত মামুন নামে এক ব্যবসায়ীর পার্টনার হলেন ঐ শীর্ষ সন্ত্রাসী। তার সঙ্গে ব্যবসার মূলধন সংগ্রহের জন্যই শিশু পরাগকে অপহারণ করা হয়।
পরাগের বাবার অনুভূতি : তিন দিন পর ঘরে ফিরেছে ছয় বছরের শিশু পরাগ মন্ডল। ওদের বাসায় আজ তাই খুশির বন্যা। ঢাকার দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যা পশ্চিমপাড়া কালীবাড়ি এলাকায় পরাগদের বাড়িতে স্বজন ও প্রতিবেশিদের ভিড়। তাদের চোখে জমে থাকা বেদনার মেঘ এখন আনন্দের অশ্রু হয়ে ঝরছে। ছেলেকে ফিরে পাওয়ার অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে পরাগের বাবা বিমল মন্ডল বলেন, ‘যেভাবে হোক, আমার ছেলেকে ফিরে পেয়েছি। এটা আমার জীবনে সবচেয়ে বড় পাওয়া। এ জন্য আমি প্রশাসন ও মিডিয়ার কাছে কৃতজ্ঞ।’ পরাগের দাদি সাবিত্রী মন্ডল বলেন, ‘টাকা গেছে, এতে দুঃখ নেই; বড় কথা হলো, নাতি ফিরে এসেছে।’ তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসীরা আমার নাতিকে টাকার জন্য অপহরণ করেছিল। পরাগকে অপহরণ না করে আমাদের কাছে টাকা চাইত, আমরা লুকিয়ে দিয়ে আসতাম। তারা টাকাও নিয়ে গেল, আর আমার নাতিকেও আহত করল। সবচেয়ে বড় কথা, আমার নাতিকে আমি ফিরে পেয়েছি। এর চেয়ে বড় আনন্দ আর নাই।’ কীভাবে ভাইকে নিয়ে কালীপূজার আনন্দ করবে, এখন সেই পরিকল্পনায় ব্যস্ত পরাগের বোনেরা। বড় বোন পিনাকি মন্ডল বলেছে, ‘ভাইকে ফিরে পেয়েছি। আজ তাকে নিয়ে পূজার আনন্দ করব, আতশবাজি ফোটাব।’
পরাগের উদ্ধার হওয়ার সংবাদ পেয়ে গত মঙ্গলবার রাতেই কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার শত শত নারী-পুরুষ তাকে দেখতে তাদের বাসায় ভিড় জমায়। আজ বেলা যত বাড়তে থাকে, ভিড়ও বাড়তে থাকে।
পরাগের ফুপু বীণা সরকার বলেন, ‘মঙ্গলবার দীপাবলি ও কালীপূজা শুরু হয়েছে। পরাগ অপহৃত হওয়ার পর আমরা খাওয়াদাওয়া বন্ধ করে দিয়েছিলাম। পূজার আয়োজন করতে পারিনি। পরিবারের সবাইকে নিয়ে এখন কালীপূজা ও আনন্দ করব।’

ব্লগার

পোষ্টটি লিখেছেন: ব্লগার

এই ব্লগে 25 টি পোষ্ট লিখেছেন .

সম্পাদক জনকন্ঠ ব্লগ।

ব্লগার

About ব্লগার

সম্পাদক জনকন্ঠ ব্লগ।
Bookmark the permalink.

Comments are closed.