নাফিসের তথ্য সংগ্রহে এফবিআই ঢাকায়

Kazi Rizwanul Hoque Nafis

কাজী রিজওয়ানুল হক নাফিস

কাজী রেজওয়ানুল আহসান নাফিসের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য বাংলাদেশে কাজ শুরু করেছে ফেডারেল ইনভেস্টিগেশন ব্যুরো বা এফবিআই। আমেরকিার এ গোয়েন্দা সংস্থার তদন্তকাজে সহায়তা করছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। এফবিআই-এর বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গতকাল সকাল থেকেই তারা মাঠে নেমেছেন। এদিকে প্রায় ২২ ঘণ্টা গোয়েন্দা হেফাজতে থাকার পর শুক্রবার রাতে নিজের বাসায় ফিরেছেন নাফিসের পিতা কাজী মোহাম্মদ আহসান উল্লাহ ও মাতা রোকেয়া সিদ্দিকা। পুলিশ ও গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশে অবস্থানরত আমেরিকান এফবিআই-এর একজন এজেন্ট (লিগ্যাল অ্যাটাচে) গতকাল সকালে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা কার্যালয়ে যান। সেখানে গিয়ে নাফিসের বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্য ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহায়তা চান। পরে গোয়েন্দা পুলিশের একাধিক টিম এফবিআই-এর তদন্তকাজে সহায়তা করার জন্য কাজ শুরু করেন। এ বিষয়ে জানতে চাইলে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সিনিয়র সহকারী কমিশনার মো. ছানোয়ার হোসেন বলেন, নাফিসের বিষয়ে তদন্ত এখনও শেষ হয়নি। তার সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজখবর নেয়া হচ্ছে। এর বাইরে আমেরিকার গোয়েন্দা সংস্থা এফবিআই-এর তদন্তেও সহায়তা করা হচ্ছে। সূত্র জানায়, নাফিসের বাসাবাড়ি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, নামাজের মসজিদ ও  প্রতিবেশীসহ সম্ভাব্য সকল বিচরণক্ষেত্রে গোয়েন্দা দল উপস্থিত হয়ে তার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ শুরু করেছে। বাংলাদেশের গোয়েন্দা সূত্র জানায়, আমেরিকার মিসৌরি ইউনিভার্সিটিতে অধ্যয়নকালীন নাফিস স্বভাবগুণে রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল। মুসলমান শিক্ষার্থীদের মধ্যে সুবোধ বালক ও সৎ চরিত্রের শিক্ষার্থী হিসেবে পরিচিতি পেয়েছিল। এ কারণে ওই ইউনিভার্সিটির ‘মুসলিম স্টুডেন্ট এসোসিয়েশন’ নামে মুসলমানদের একটি বৈধ সংগঠনের ভাইস প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করা হয় তাকে। এরপরই সে এফবিআই-এর লক্ষ্যবস্তু হয়ে পড়ে। এ সংস্থা তার পেছনে লাগিয়ে দেয় গুপ্তচর। নজরদারি শুরু করে নাফিসের অবস্থান, কর্মকাণ্ড ও গতিবিধির ওপর। মনস্তাত্ত্বিকভাবে তাকে ইসলামী চরমপন্থি করে তোলে। পাশাপাশি তার যাবতীয় তথ্য সংগ্রহ করে আমেরিকার ওই গোয়েন্দা দল। এরপরই এফবিআই-এর সৃষ্ট নাটকের প্রধান খল চরিত্রের পাত্র বানিয়ে বিশ্বে প্রচার করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, এফবিআই যেভাবে ঘটনাটি সাজিয়েছে তা নিখুঁত হয়নি। আদালতে যে অভিযোগ দায়ের করেছে তাতেও একাধিক জায়গায় গলদ রয়েছে। তার মন্তব্য- এ ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে  বিচার হলে উল্টো এফবিআই-এর কর্মকর্তারাই ফেঁসে যাবেন। গোয়েন্দা সূত্র জানায়, বাংলাদেশী সন্ত্রাসীরা বিস্ফোরণের কাজে সস্তা মানের সালফার ব্যবহার করে থাকে। এগুলো প্রতিকেজি ১০ হাজার টাকায় সংগ্রহ করে থাকে। অথচ এফবিআই দাবি করেছে, বাংলাদেশী যুবক নাফিস ১০০ পাউন্ড ওজনের অ্যামোনিয়াম ফসফেট নিজেই কিনেছে। এর দাম অন্ততপক্ষে কোটি টাকা। বাংলাদেশী গোয়েন্দা দলের প্রশ্ন- নাফিস ওই টাকা কোথায় পেলো? নাফিসের পিতা কাজী আহসান উল্লাহ গোয়েন্দাদের জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করে নাফিস তার টিউশন ফি যোগানোর চেষ্টা করেছে। যে টাকা যোগাড় করতে পারেনি তা বাড়ি থেকে দেয়া হয়েছে। মিসৌরি ইউনিভার্সিটির বিবিএ পড়াকালে নাফিসকে প্রতি সেমিস্টারের টিউশন ফি বাবদ ৫৯৪০ ডলার গুনতে হতো। ফল ভাল করলে নির্ধারিত ওই ফি কমানোর সুযোগ ছিল। এক্ষেত্রে তাকে দিতে হতো ২৯৭০ ডলার। গ্রেপ্তার হওয়ার সপ্তাহখানেক আগেও নাফিসের পিতা তার ছেলের টিউশন ফি’র জন্য ৫০০ ডলার পাঠিয়ে দেন। গোয়েন্দারা জানান, নাফিস প্রথমে মিসৌরি ইউনিভার্সিটিতে বিবিএ বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করে। পরে ভাল চাকরির আশায় ওই বিষয় বদলে সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে পড়তে আগ্রহী হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে নিউ ইয়র্কের এএসএ ইনস্টিউটে সাইবার সিকিউরিটি বিষয়ে নন-ক্রেডিট কোর্স শুরু করে। সেখানে পড়াশোনার পাশাপাশি ইসলামিক পিৎজা শপে দিনে ৮ ঘণ্টা কাজ করতো।
নাফিসের মুক্তির জন্য প্রার্থনা: আমেরিকায় গ্রেপ্তার নাফিসের মুক্তির জন্য প্রার্থনার আয়োজন করেছেন স্বজন ও শুভাকাঙক্ষীরা। শুক্রবার যাত্রাবাড়ী ওয়াসা রোডের মসজিদে তার জন্য বিশেষ দোয়ার আয়াজন করা হয়। এছাড়া পরিবারের স্বজনরা পৃথকভাবে প্রার্থনার আয়োজন করেন। সমবয়সী প্রতিবেশীদের চোখে নাফিস ছিল বোকাসোকা ছেলে। উত্তর যাত্রাবাড়ীর বাসিন্দা ও তেজগাঁও কলেজের শিক্ষার্থী সোহেল বলেন, ওর সঙ্গে প্রতিদিনই দেখা হতো। আমরা যখন রাস্তার পাশে আড্ডা দিতাম, ও তখন হেঁটে হেঁটে মসজিদে যেতো। আমাদের সঙ্গে কথা না বলায় আমরাও ওর সঙ্গে কথা বলতাম না। ওকে আমরা নির্বোধ বলেই জানি। ওর মতো বোকার পক্ষে আমেরিকায় হামলা চালানোর পরিকল্পনা আষাঢ়ে গল্পই মনে হচ্ছে। নাফিসের বাড়ির গলির মুখেই ২০ বছর ধরে মুদি দোকানের ব্যবসা করছেন হাসান আলী। তিনি বলেন, যা সত্য তাই বলছি, নাফিসের মধ্যে কখনই খারাপ কিছু দেখিনি। বাসার সামনে এলাকার ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা দিলেও আজান হলেই মসজিদে যেতো। কোন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার কোন সম্পর্ক ছিল না। এ বিষয়ে কোন আলোচনাও করতে শুনিনি। ওয়াসা রোডের বায়তুল আমান মসজিদের ইমাম ইউসুফ গুলজারি বলেন, ২০ বছর ধরে এ এলাকায় আছি। ছোটকাল থেকেই নাফিসকে ভাল ছেলে হিসেবে চিনি। নিয়মিত মসজিদের জামাতে নামাজ পড়লেও কোন দলের কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা শুনিনি।
উল্লেখ্য,  ব্রুকলিন ফেডারেল কোর্টে নাফিসের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলায় বলা হয়েছে, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে শিক্ষা ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে যায় নাফিস। আল-কায়েদা নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ যুবক সন্ত্রাসী হামলা চালানোর জন্য বিশ্বস্ত লোক খোঁজা শুরু করার পর গত জুলাইয়ে এফবিআই-এর নজরে পড়েন। বুধবার যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের বিবৃতিতে বলা হয়, কাজী মোহাম্মদ রেজওয়ানুল আহসান নাফিস (২১) নামের ওই বাংলাদেশীর বিরুদ্ধে ব্যাপক বিধ্বংসী অস্ত্রের ব্যবহার ও জঙ্গি সংগঠন আল-কায়েদাকে সহযোগিতা করার অভিযোগ আনা হয়। দোষী সাব্যস্ত হলে তার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হতে পারে। এফবিআই’র দাবি-স্থানীয় সময় বুধবার সকালে (বাংলাদেশে বুধবার সন্ধ্যা) মানহাটনে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সামনে ‘বিস্ফোরকভর্তি’ ভ্যান দাঁড় করিয়ে নাফিস পাশের মিলেনিয়াম হিল্টন হোটেলে যায়। সেখান থেকে ভ্যানে রেখে আসা সেলফোনে বার বার কল দিতে থাকে এক হাজার পাউন্ড (৪৫৪ কেজি) বিস্ফোরকে বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য। কিন্তু ভ্যানে সত্যিকারের বিস্ফোরক না থাকায় সেটি আর ফাটেনি। পুলিশ বলছে, নাফিস এফবিআই-এর পাতা ফাঁদে পা দেয়। তার ওপর জুলাই মাস থেকে নজর রাখা হয়েছিল। ভ্যানটি চালিয়ে আসার সময় তার পাশে ছিল এফবিআই-এর একজন কর্মকর্তা। নাফিস চিনতে পারেনি। নাফিসের বিরুদ্ধে মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, নাফিস যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতি তছনছ করার চেষ্টা করেছিল। এজন্য প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোন ব্যক্তিকে হত্যা করা ও পরে রিজার্ভ ব্যাংক, নিউ ইয়র্ক স্টক এক্সচেঞ্জ ও বাল্টিমোরে সেনাবাহিনীর স্থাপনায় বোমা হামলার পরিকল্পনা করে।

এফবিআই’র অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নাফিস

নিউ ইয়র্কের ফেডারেল ব্যাংক ভবনে বোমা হামলার পরিকল্পনার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন কাজী রেজওয়ানুল আহসান নাফিস। গতকাল যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় আইনজীবীর কাছে নাফিস জানিয়েছেন এফবিআই যে অভিযোগ করেছে তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
ইস্টার্ণ ডিস্ট্রিক্ট অব নিউ ইয়র্ক এর সহকারি ফেডারেল ডিফেন্ডার হেইডি ই সিজারি নাফিসের সঙ্গে সাাৎ করে তার বক্তব্য শোনেন। নাফিস ব্র্রুকলিন মেট্রোপলিট্ন ডিটেনশন সেন্টারে বন্দি আছেন। আইনজীবী সিজারি নাফিসের সঙ্গে সাাতের পর তার সম্পর্কে নাফিসের পিতার কাছে একটি ইমেইল বার্তা পাঠিয়েছেন। এতে তিনি জানিয়েছেন নাফিস ভাল আছেন। একই সঙ্গে নাফিস দাবি করেছেন মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থার অভিযোগ ভিত্তিহীন। রাতে ইমেইল বার্তার বিষয়টি মানবজমিন অনলাইনকে নাফিসের পরিবারের প থেকে নিশ্চিত করা হয়।
এদিকে নাফিসের সঙ্গে একান্তে কথা বলতে কনস্যুলার একসেস চেয়েছে বাংলাদেশ মিশন। শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শেষে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত একরামুল কাদের জানিয়েছেন, মিশনের প থেকে নাফিসের সঙ্গে সাাতের সময় চেয়েছি। নাফিস যদি আমাদের কাছে আইনগত সহায়তা প্রার্থনা করে তাহলে তা প্রদান করা হবে।

ব্লগার

পোষ্টটি লিখেছেন: ব্লগার

এই ব্লগে 25 টি পোষ্ট লিখেছেন .

সম্পাদক জনকন্ঠ ব্লগ।

ব্লগার

About ব্লগার

সম্পাদক জনকন্ঠ ব্লগ।
Bookmark the permalink.

Comments are closed.